সাভারের জারবেরা বাগানে

লাইফস্টাইল

যেকোনো দুর্যোগেই মনোবল চাঙ্গা রাখা অধিক প্রয়োজন। মন প্রফুল্ল তো সব মুশকিল সমাধান। সেই সমাধানের খোঁজেই সাত-সকালে ছুটলাম সাভারের বিরুলিয়া। সঙ্গী জসিম, নাজমুল ও শাকিল।

বহুদিন পর ছুটির দিন, শুক্রবারের আমেজ ভর করেছিলো দেহ-মনে। প্রথমে ভুল তথ্যে চলে যাই সাদুল্লাপুর। কী আর করা, ছোট্ট একটি রেস্তোরাঁয় সকালের নাশতাটা সেরে নিই।

মজার ব্যাপার হলো, মাঝেমধ্যে কিছু ভুল-যা আবারো সেখানে টেনে নেয়। রেস্তোরাঁর খাস্তা পরোটা, আবারো হয়তো সাদুল্লাপুর যেতে বাধ্য করেবে। খেয়ে-দেয়ে ডানে-বামে খোঁজখবর নিয়ে ছুটলাম আকরান ফকিরপাড়া গ্রামে। গ্রাম্যপথে ছুটছে বাইক। দুইপাশে সবুজ বন-বনানী। খেজুর গাছে ঝুলে থাকা টসটসে পাকা খেজুরের ঝোকা। পাকা কাঁঠালের ম-ম ঘ্রাণ শুকতে শুকতেই পৌঁছে যাই ফকিরপাড়া।

নাম যাই হোক, কিন্তু প্রকৃতির প্রাচুর্যতা নজরকাড়া। এই গ্রামেই রয়েছে জারবেরা ফুলের বাগান। অনুমতি নিয়ে বাগানে প্রবেশ করতেই, একরাশ মুগ্ধতা ভর করে। বাগানের আল ধরে এগোতে থাকি। হরেক রঙের জাররেরা ফুল। সাদা, হলুদ, বেগুনি, লাল, গোলাপি, বাসন্তীসহ অনেক রঙ।

জারবেরা ফুল অ্যাসটারেসি পরিবারভুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ফুল। জার্মান পরিবেশবিদ ট্রগোট জার্বার এর নামানুসারে এই ফুলটির নাম জারবেরা রাখা হয়েছে। জারবেরা অন্যান্য ফুলের চাইতে এটি ফুলদানিতে অনেক বেশিদিন সতেজ থাকে।

যার ফলে আন্তর্জাতিক ফুল বাণিজ্যে জারবেরার উল্লেখযোগ্য চাহিদা রয়েছে বেশ। এই ফুলের মোট ৪০টি প্রজাতি রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনিস্টিউট জারবেরা ফুলের দুটি জাত বারি-১ ও বারি-২ উদ্ভাবন করেছে। জারবেরা সবধরণের জলবায়ুতে কমবেশি চাষাবাদ করা যায়। এটি খুবই কষ্ট সহিষ্ণু উদ্ভিদ।

শীতকালে উন্মুক্ত খোলা আকাশের নিচে আর গ্রীষ্মে ভালো মানের জারবেরা ফলনের জন্য, বাগানে পলিসেড ব্যবহার করা হয়ে থাকে। জারবেরা ফুলের চারা সারা বছরই রোপণ করা যায়। তবে উন্নতমানের ফুলের জন্য অক্টোবর-নভেম্বর রোপণের মোক্ষম সময়।

বাগান মালির সাথে কথা প্রসঙ্গে জানতে পারি,ফকিরপাড়া হতে কিছুটা দূরে আইঠর গ্রামে রয়েছে আরো অনেক বড় জারবেরা বাগান। ওয়াও! তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ছুটলাম আইঠর। ছুটতে ছুটতে বউবাজার পার হয়েই আইঠর গ্রামের শুরুতেই চোখে পড়ল লাল গোলাপ বাগান। পড়তে দেরি কিন্তু ব্রেক কষতে দেরি নয়। এতদিন জানতাম সাদুল্লাপুর আর শ্যামপুরেই বুঝি গোলাপ বাগান রয়েছে।

কিন্তু সেই ধারণা এবার ফিকে। গাছে গাছে টকটকে লাল গোলাপও বেশ ফুটে রয়েছে। পাশেই দেশি মরিচ ও কাঁঠালের বাগান। কোনো কোনো গাছে এমন পরিমাণ কাঁঠাল ঝুলে রয়েছে,যা অবিশ্বাস্য ফলন। একেবারে গাছের গোড়া হতে মগডাল। কিছুটা সময় ঘুরেই আবারো বাইক স্টার্ট। অল্প সময়ের মধ্যেই আইঠর গ্রামের জারবেরা বাগানের সদর দরজায় পৌঁছি।

গেটে বড় করে লেখা মহিলা প্রবেশ নিষেধ। বেশ আশ্চর্য হই। ফুলের প্রতি নারীরা দুর্বল। অথচ তাদের উপরেই এরকম নিষেধাজ্ঞা।যাক আগে নিজেরা ঢুকি,পরে না হয় এর কারণ জানা যাবে। কিন্তু আমরাও প্রথমে হোঁচট খেলাম। ম্যানেজার সাহেব বাগানে নেই। অনুমতির জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

দুয়ারে বসে অপেক্ষা করার মতো পোলাপানতো আর দে-ছুট নয়।তাই আশপাশ চক্কর মারতে থাকলাম। চোখে ধরা পড়তে থাকল বিশাল বিশাল সবজি বাগান। করলা, শশা, মিষ্টি কুমড়াসহ ছোটবড় অনেক সবজি বাগান। অনুমতি নিয়ে মিষ্টি কুমড়ার ফুল ছিড়ে নিলাম কিছু। বাগান ঘুরতে ঘুরতেই জারবেরা বাগানের ভিতরে প্রবেশের ডাক পড়ল। বাগানে ঢুকেই হলাম আত্মহারা।

পলিশেডে বিশাল জারবেরা ফুলের বাগান। একপাশ হতে আরেকপাশে দৃষ্টি ক্ষিণ হয়ে আসে। ফুটে থাকা নানান রঙের জারবেরা ফুল। এই ফুল একসময় ভারত হতে চোরাই পথে এ দেশে আসত। এখন জারবেরা বাংলাদেশেই ব্যাপক চাষ হচ্ছে।

জারবেরা ফুলের আরেক নাম ডেইজি। দক্ষিণ আমেরিকা,আফ্রিকা ও এশিয়ায় জারবেরা ফুল ছড়িয়ে আছে। এই ফুলের চাহিদা দিনকে দিন জনপ্রিয়তা হওয়ার কারণ- জারবেরা ফুল ফুটার পর গাছে প্রায় ৪০-৪৫ দিন ও গাছ থেকে ছেঁড়ার পর প্রায় ১২-১৫ দিন পর্যন্ত সতেজ থাকে।

ফলে বাসাবাড়ি ও অফিসের ফুলদানিতে সাজানোর জন্য, জারবেরা ফুলের ব্যাপক চাহিদা বেড়েই চলছে। সূর্যমুখীর মতো দেখতে বাহারি রঙের জারবেরা ফুল দেখতে দেখতেই ঝুম বৃষ্টি। তাই বাগানে কোনো মহিলা প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা আছে,তা জানার মতো দায়িত্বশীল কাউকে না পেয়ে – অগত্যা ফিরতি পথ ধরি।

যাবেন কীভাবে: গুলিস্তান,গাবতলীসহ ঢাকার অনেক বাসস্ট্যান্ড হতেই সাভারে বাস চলাচল করে থাকে। সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড হতে অটো-সিএনজিতে করে আকরান ফকিরপাড়া ও আইঠর গ্রামে যাওয়া যাবে।