http://igeneration.com.bd/wp-content/uploads/2021/04/ইউনেস্কোর-ঘোষিত-ঐতিহাসিক-মসজিদের-শহর-বাগেরহাট.jpg

ইউনেস্কোর ঘোষিত ঐতিহাসিক মসজিদের শহর বাগেরহাট

ইসলাম

দেশের প্রাচীন জনপথগুলোর মধ্যে বাগেরহাট অন্যতম। ভৌগলিক অবস্থান, প্রকৃতি ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনার কারণে বাগেরহাট শহর জনপ্রিয়তায় অনেক এগিয়ে। প্রাচীন আমলেও বাগেরহাটে জনবসতির প্রমাণ পাওয়া যায়। ব্রিটিশ শাসন আমলে ১৮৪২ সালে খুলনা মহাকুমার অন্তর্গত একটি থানা এবং ১৮৬৩ সালে যশোর ইউনেস্কোর ঘোষিত ঐতিহাসিক জেলা অন্তর্গত একটি মহাকুমা ছিল বাগেরহাট। দেশ স্বাধীন হওয়ার ১৩ বছর পর ১৯৮৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে বাগেরহাটের যাত্রা শুরু হয়।

খানজাহান আমলে নির্মিত ইসলামী স্থাপত্য-রীতির মসজিদগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে ইউনেস্কো ১৯৮৫ সালে বাগেরহাটকে ঐতিহাসিক মসজিদের শহর হিসেবে ঘোষণা করে এবং ৩২১তম বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করে। এর মধ্যে বাগেরহাটের ১৭টি স্থাপনাকে তালিকাভুক্ত করা হয়, যার ১০টিই মসজিদ। মসজিদগুলো হল বিশ্ব-ঐতিহ্য ষাট গম্বুজ মসজিদ, বিবি বেগুনি মসজিদ, চুনাখোলা মসজিদ, নয় গম্বুজ মসজিদ, জিন্দা পীরের মসজিদ, দশ গম্বুজ মসজিদ, রন বিজয়পুর মসজিদ, রেজা খোদা মসজিদ, সিংগাইর মসজিদ ও এক গম্বুজ মসজিদ।

বাগেরহাট শহরের আশপাশ জুড়ে রয়েছে এ মসজিদগুলো। এছাড়া খানজাহান আলী (রহ) এর সমাধি, পীর আলী তাহেরের সমাধি, জিন্দা পীরের সমাধি, সাবেক ডাঙ্গা প্রার্থনা কক্ষ, খানজাহান আলী (রহ) এর বসতভিটা, বড় আদিনা ডিবি, খানজাহানের তৈরি প্রাচীন রাস্তাকেও বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করা হয়।

ষাটগম্বুজ মসজিদ
মসজিদগুলোর মধ্যে সব থেকে আকর্ষণীয়, জনপ্রিয় ও বাংলাদেশে প্রাচীন আমলে নির্মিত সর্ববৃহৎ মসজিদ হচ্ছে ষাটগম্বুজ মসজিদ। বাগেরহাট শহর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে সুন্দরঘোনা গ্রামে অবস্থিত এ মসজিদ। খুলনা-বাগেরহাট মহাসড়কের ষাটগম্বুজ বাসস্ট্যান্ডের সঙ্গেই এ মসজিদের প্রধান ফটক।

মসজিদটির পশ্চিমে রয়েছে বিশালাকৃতির ঘোড়া দিঘি এবং পশ্চিমে কোদালধোয়া দিঘি। উত্তরে খানজাহানের বসত ভিটা ও দক্ষিনে খুলনা-বাগেরহাট মহাসড়ক এবং সড়কের পাশেই রয়েছে তার আমলের সিংড়াই মসজিদ। এ মসজিদের উত্তর-পূর্ব কোণে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে রয়েছে খানজাহান আলীর কবর ও খানজাহান আলী দিঘি।

ষাটগম্বুজ মসজিদ নামে পরিচিত হলেও মসজিদটিতে মোট ৮১টি গম্বুজ রয়েছে। চার কোণের বুরুজের (মিনার) ওপর ৪টি এবং পূর্ব-পশ্চিমে লম্বালম্বি ৭টি সারিতে ১১টি করে ৭৭টি গম্বুজ রয়েছে। এর মধ্যে ৭টি গম্বুজ চার কোণবিশিষ্ট। গম্বুজগুলোর ভার বহনের জন্য মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত ৬০টি পাথরের খিলান-স্তম্ভ আছে। কেউ কেউ মনে করেন, এই ষাটটি খাম্বা থেকেই ষাটগম্বুজ নামকরণ হয়েছে।

দক্ষিণ-পূর্বকোণের মিনারের মধ্য দিয়ে ছাদে ওঠার জন্য একটি সিঁড়ি রয়েছে, যাকে রওশনকোঠা বলা হয়ে থাকে। উত্তর-পূর্ব কোণের মিনারেও ছাদে ওঠার সিঁড়ি ছিল, যাকে আন্ধার কোঠা বলা হত। অবশ্য এটি এখন বন্ধ রয়েছে।

৮ ফুট পুরু দেয়ালের এই মসজিদটির মোট আয়তন ১৭ হাজার ২‘শ ৮০ বর্গফুট। উত্তর-দক্ষিণে ১৬০ এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১০৮ ফুট। মেঝে থেকে ছাদের উচ্চতা ২১ ফুট।

মসজিদের ভেতরের পশ্চিম দেয়ালে ১০টি মিহরাব আছে। মাঝের মিহরাবটি আকারে বড় এবং তুলনামূলক অধিক কারুকার্যমণ্ডিত। মিহরাবটির দক্ষিণে ৫টি ও উত্তরে ৪টি মিহরাব আছে। প্রধান মেহরাবের পাশে একটি দরজাসহ মোট ২৬টি দরজা রয়েছে। মূল মসজিদের সামনে দু্ইটি বিশালাকৃতির রেইনট্রি গাছ রয়েছে। মসজিদের চারদিকে রয়েছে উঁচু দেয়াল (পাঁচালি)।

মসজিদটি দেখতে প্রতিদিন হাজার মানুষ আসে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন মসজিদে প্রবেশ করতে দেশি পর্যটকদের জন্য ২০ টাকা, বিদেশিদের জন্য ২০০ টাকা, সার্কভুক্ত দেশসমূহের নগরিকদের জন্য ১০০টাকা এবং মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য জনপ্রতি ৫ টাকা (প্রবেশ ফি/টিকিট) দিতে হয়।

সিঙ্গাইর মসজিদ
ষাটগম্বুজ মসজিদের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে খুলনা-বাগেরহাট মহাসড়ক এবং সড়কের পাশেই রয়েছে খানজাহান আমলের সিঙ্গাইর মসজিদ। এক গম্বুজ বিশিষ্ট এ মসজিদের (বাইরের দিকের১১.৮৮ মিঃ ঢ১১.৮৮মিঃ) পলেসত্মরা বিহীন দেয়ালগুলো গড়ে ২.১০মিঃ পুরু। প্রত্যেক কোনে বাইরের দিকে গোলাকারে বর্ধিত একটি করে মিনার রয়েছে। পূর্ব দেয়ালে ৩টি, উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালের প্রতিটিতে  একটি করে খিলান দরজা রয়েছে। ভিতরে পশ্চিম দেয়ালের মাঝামাঝি অংশে দুই পাশে দুইটি কুলঙ্গীসহ একটি অবতল মিহরাব আছে। অনুরূপ কুলঙ্গী উত্তর ও দক্ষিণের দরজাগুলোর দুপাশেওআছে। এ মসজিদটিতে বর্তমানে নিয়মিত  নামাজ আদায় হয়। ষাটগম্বুজে আসা পর্যটকেরা যাওয়ার পথে এখানেও ঘুরে যান।

বিবি বেগুনি মসজিদ
ষাটগম্বুজ মসজিদ থেকে আধা কিলোমিটার পশ্চিমে ঘোড়া দিঘির পশ্চিম পাড়ে একগম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদটি অবস্থিত। এ মসজিদের চার কোণে চারটি গোলাকার মিনার রয়েছে। পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মেহরাব, উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে একটি করে এবং পূর্ব দেয়ালে তিনটি করে খিলান দরজা রয়েছে। কেন্দ্রীয় মেহরাবটি অন্যগুলোর চেয়ে বড় ও সুসজ্জিত। মসজিদটির নির্মাণশৈলী ও স্থাপত্যরীতি অনুযায়ী ধরে নেওয়া হয় খানজাহানের আমলে নির্মিত। নামকরণের জন্য সঠিক কোনো তথ্য না পাওয়া গেলেও ধরে নেয়া হয়, খানজাহানের ঘনিষ্ট সহযোগী বেবি বেগুনীর নামে এ মসজিদের নামকরণ করা হয়েছে। বর্তমানে স্থানীয়রা এখানে নামাজ আদায় করেন। পর্যটকদের তেমন আনাগোনা না থাকলেও প্রত্নতত্ত্ব ও খানজাহান গবেষকরা নিয়মিত এ মসজিদে যাতায়াত করেন।