সামর্থ্যবান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হজ আবশ্যক

ইসলাম

ইসলামের ফরজ পাঁচটি। প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি: আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ্ নেই, হযরত মুহম্মদ (সা.) তার বান্দা ও রাসূল এ কথার সাক্ষ্য দেয়া, সালাত (নামাজ) কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, বায়তুল্লাহর হজ করা এবং মাহে রমজানে রোযা রাখা (বোখারী ও মুসলিম)।  তবে ফরজ ইবাদত সমূহের মধ্যে যাকাত ও হজের ক্ষেত্রে আর্থিক সামর্থ্যের বিধান রয়েছে। অর্থ্যাৎ প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমের জন্য হজ পালন করা অত্যাবশকীয়।

বলে রাখা প্রয়োজন, অনেক ক্ষেত্রে যাকাত ফরজ না হয়েও হজ ফরজ হতে পারে। তবে হজ ও যাকাতের ক্ষেত্রে আর্থিক সামর্থ্য থাকা আবশ্যক। হজ ও যাকাতের কিছু পার্থক্য রয়েছে। যাকাতের সঙ্গে নিসাবের সম্পর্ক। যে পরিমাণ অর্থ থাকলে যাকাত ফরজ হয়, তাকে নিসাব বলে।

আর মক্কায় গিয়ে আবার ফিরে আসা পর্যন্ত সামর্থ্য থাকলে হজ ফরজ হয়। কেউ যদি সম্পদ অথবা স্থাবর সম্পত্তির কিছু অংশ বিক্রি করে হজে যায় আবার হজ থেকে ফিরে এসে বাকি সম্পত্তি দিয়ে জীবন নির্বাহ করতে পারে তবে তার ওপর হজ ফরজ। (ইমদাদুল আহকাম : ২/১৫২; আহসানুল ফাতাওয়া : ৪/৫১৬)

মনে রাখতে হবে- হজ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তম্ভ।

হজে বায়তুল্লাহ সমগ্র মুসলিম মিল্লাতের জন্য একটি ঐতিহাসিক বিশ্ব সম্মেলন। যার মাধ্যমে মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ সুদৃঢ় হয়। যেখানে নেই কোনো ভেদাভেদ এবং নেই কোনো আত্নগরিমা ও অহংকার। সব মুসলিমের একই পোশাক, একই কথা- ‘লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক! লাব্বাইকা লা-শারিকা লাকা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদা ওয়ানি’মাতা লাকাল মুলক লা-শারিকা লাকা।’

এ হজ সম্পাদন  করার জন্য আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘মানুষের ওপর মহান আল্লাহর অধিকার রয়েছে যে, যার এ ঘর পর্যন্ত পৌঁছার সামর্থ্য আছে, সে যেন তার হজ সম্পাদন করে। আর যে মহান আল্লাহর এ নির্দেশ পালন করতে অস্বীকার করবে তার জেনে রাখা উচিত যে, মহান আল্লাহ দুনিয়াবাসীদের প্রতি বিন্দু মাত্র মুখাপেক্ষী নন।’ (সূরা: আলে ইমরান, আয়াত: ৯৭)।

সুতরাং হজ সম্পাদন করা মহান আল্লাহর অমোঘ বিধান। এ ইবাদত থেকে বিরত থাকার কোনোই অবকাশ নেই। দ্বীনে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে হজ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। আর এর ইতিহাস-ঐতিহ্য বিশাল। মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.) জীবনে একবারই হজ সম্পাদন করেছিলেন। তাঁর হজ কাফেলায় ছিলেন লক্ষাধিক সাহাবায়ে কিরাম। যারা ছিলেন মহানবী (সা.) এর একান্ত অনুসারী।

যাদের প্রশংসা করেছেন স্বয়ং মহান রাব্বুল আলামিন। যেমন-তিনি ইরশাদ করেন, ‘মুহাজির ও আনসারদের যারা প্রথম সারির অগ্রণী, আর যারা তাদের যাবতীয় সৎকর্মে অনুসরণ করেছে। আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট, তাদের জন্য তিনি প্রস্তুত করে রেখেছেন জান্নাত, যার তলদেশে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত। সেখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে। এটাই হলো মহান সফলতা।’ (সূরা: আত তাওবাহ, আয়াত: ১০০)।

মহনবী (সা.) বিদায় হজে গোটা মুসলিম জনতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেছিলেন যা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়েছে। আজও যদি মুসলিম মিল্লাত মহানবী (সা.) এর সেই বক্তব্য মেনে চলে, তাহলে তারা অবশ্যই পাবে তাদের হারানো গৌরব।

রাসূলে করিম (সা.) বিদায় হজের বক্তব্যের এক পর্যায়ে বলেছিলেন, ‘আমি তোমাদের জন্য দুটি জিনিস রেখে গেলাম, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা এ দুটি জিনিসকে আঁকড়ে ধরে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। তন্মধ্যে একটি হলো মহান আল্লাহর বাণী আল কোরআনুল কারিম। অপরটি হলো আমার সুন্নাহ। অর্থাৎ মহানবী (সা.) এর হাদিস।

কাজেই দুনিয়াতে শান্তি ও পরকালে মুক্তি পেতে হলে আমাদের অবশ্যই আল কোরআনুল কারিম ও সহিহ সুন্নাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। আর যাবতীয় তরিকা বা ফিরকা বাদ দিয়ে মহানবী (সা.) এর তরিকায় ফিরে আসতে হবে। মহানবী (সা.) এবং সাহাবায়ে কিরামের অনুসরণের হজ সম্পাদন করতে হবে যাবতীয় শিরক ও বিদাত পরিহার করতে হবে। কেননা শিরক ও বিদাত মানুষকে পথভ্রস্ট করে দেয়। যার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ।

হজে বায়তুল্লাহ অবশ্যই মহান আল্লাহর জন্য নিবেদিত হয়ে করতে হবে। যারা এমনটি করবে তাদের প্রতিদান বিশাল। যেমনটি মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, মাকবুল বা গ্রহণযোগ্য হজের প্রতিদান হলো জান্নাত। (বুখারি- হা: ১৭৭৩, মুসলিম-হা: ১৩৪৯)।

অপর হাদিসে মহানবী (সা.) আরো ঘোষণা করেন, ‘তোমরা হজ ও ওমরাহ সম্পাদন করতে থাকো। কেননা হজ ও ওমরাহ দারিদ্রতা ও গুনাহকে দূরীভূত করে। যেমন কামারের হাপর, লৌহ, স্বর্ণ ও রৌপ্যের আবর্জনা দূরীভূত করে দেয়। (তিরমিযী-হা: ৮১০)।

অতএব, হজে বায়তুল্লাহর মতো বিশাল পুণ্যের কাজে বেশি দেরি করার কোনোই সুযোগ নেই। বরং সামর্থ্যবান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হজ করা উচিত। কেননা হায়াত ও মউতের খবর আমাদের কারো কাছেই নেই। সে জন্য হজ দ্রুত সম্পাদন করা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অপরিহার্য। এ মর্মে মহানবী (সা.) এর একটি বাণী প্রণিধানযোগ্য। তিনি ইরশাদ করেন, ‘তোমরা ফরজ হজের জন্য তাড়াতাড়ি করো। কেননা তোমাদের কেউই একথা জানে না যে, তার ভাগ্যে কি রয়েছে। (আহমাদ-হা:৪১২/১৩৩৭)।

সুতরাং হজ সফরের সামর্থ্য লাভের সঙ্গে সঙ্গেই হজ সম্পাদন করা আবশ্যক। নানা অজুহাত দেখিয়ে বিলম্ব করার কোনোই সুযোগ নেই। বরং মহান আল্লাহর বিধান পালনার্থে ও জান্নাত লাভের আশায় হজ পালন করা একান্ত উচিত।

পরিশেষে পাঠক-পাঠিকাসহ সব মুসলিম মিল্লাতের প্রতি উদাত্ত আহ্বান- আসুন! আমাদের মধ্যে যাদের হজ সম্পাদন করার মতো আর্থিক ও শারীরিক সামর্থ্য আছে, আর দেরি নয়, এখনই হজ পালন করার ইচ্ছা পোষণ করি এবং মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জন করি।

Tagged