http://igeneration.com.bd/wp-content/uploads/2021/05/Real-Sleeping-Beauty-has-slept-for-5-years-in-a-row.jpg

বাস্তবের স্লিপিং বিউটি, টানা ৫ বছর ঘুমিয়ে কাটিয়েছে

ফিচার

দুষ্টু পরীর অভিশাপে ঝুমপুরীর রাজকন্যা ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিয়েছে বছরের পর বছর। পদ্ম বনে হিরা বসানো সোনার খাটে টানা ১০০ বছর ঘুমিয়ে ছিল সেই রাজকন্যা। তার মাথার কাছে সোনার কাঠি, পায়ের কাছে রূপার কাঠি। ভিনদেশি রাজপুত্র এসে সেই কাঠি পাল্টাপাল্টি করে জাগিয়ে তুলেছিল ঘুমন্তপুরীর সেই কন্যাকে। রূপকথার সেই গল্প নিশ্চয় মনে আছে সবার। বাস্তবের স্লিপিং বিউটি, টানা ৫ বছর ঘুমিয়ে কাটিয়েছে।

তবে বাস্তবের রক্তমাংসের পৃথিবীতেও রয়েছে স্লিপিং বিউটিরা! ব্রিটিশ তরুণী বেথের কাহিনী রূপকথার গল্পের থেকে কোনো অংশে কম নয়। লন্ডনের মানুষের মুখে মুখে ফেরে সত্যিকারের এই স্লিপিং বিউটির গল্প। ২০১১ সালের নভেম্বর মাস। ইংল্যান্ডের স্টকপোর্ট শহরে সাজানো গোছানো ছোট্ট একটা বাড়িতে তখন আয়োজন চলছে জন্মদিনের। বাড়ির সবার প্রিয় ছটফটে মেয়ে বেথ গুডিয়ার ১৭ তম জন্মদিন সেদিন। উৎসবের আগের দিন থেকেই বাড়িটাকে নিজের মনের মতো করে সাজিয়ে তুলছে বেথের মা।

আর কিছুক্ষণের মধ্যেই কাটা হবে বার্থ ডে গার্লের জন্য নিয়ে আসা বিশেষ কেক। এমনিতেই সুন্দরী , তার উপর জন্মদিনের সাজে অন্য সব দিনের চেয়ে সেদিন আরও বেশি সুন্দর লাগছিল বেথকে । মিষ্টি মুখের মেয়েটাকে ঘিরে সকাল থেকেই বন্ধুবান্ধব আর কাছের আত্মীয় স্বজনদের ভিড়। কেক কাটতে যাওয়ার একটু আগে কোনো এক কারণে ক্লান্ত লাগতে শুরু করে বেথের। সকাল থেকে বন্ধুদের ফোন, হৈ-হুল্লোড় এসবের মাঝে হয়তো ক্লান্ত হয়ে পড়েছে এই ভেবে একটু বিশ্রাম নেবার জন্য সে শরীরটাকে এলিয়ে দেয় সোফায়। তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে কেউ খেয়াল করে নি। কিছুক্ষণ পর সবার খেয়াল হলোসবার।

এভাবে হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়ায় আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধবেরা প্রথমদিকে একটু অবাক হলেও তাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলার চেষ্টা করেনি কেউ। সবাই ভেবেছিল, হয়তো কোনও কারণে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছে বেথ। তার জেগে ওঠার অপেক্ষায় কেটে যায় বেশ কিছুক্ষণ। কিন্তু ঘুম ভাঙা তো দূর, আরও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে বেথ। জন্মদিন শেষ হতে চলেছে। সবাই অপেক্ষা করছে , অথচ যাকে ঘিরে এত আয়োজন, সোফার এককোণে নিঃসাড়ে ঘুমিয়ে রয়েছে সে। ঘুম ভাঙার লক্ষণই নেই কোনো।

সেদিন থেকেই সবকিছু কেমন ওলোটপালট হয়ে গেল গুডিয়ার পরিবারে। অনেক ডাকাডাকির পরও সেই রাতে ঘুম ভাঙলোনা বেথ গুডিয়ারের। শুধু সে রাতেই নয়, পরবর্তী ৫ বছর সেভাবে ঘুম থেকে উঠতেই পারেনি বেথ। কিছু সুন্দর মুহূর্তের স্মৃতি নিয়ে জন্মদিনের সন্ধ্যায় ঘুমাতে গেল মেয়েটি। তারপর থেকে রূপকথার বইয়ে পড়া স্লিপিং বিউটির মতো সেও যেন রয়ে গেল ঘুম না ভাঙার দেশে। এমন অবিশ্বাস্য ঘটনা বাস্তবেও হয়! মানতে পারছিল না বেথের পরিবার। শুরু হল চিকিৎসা। কেন বেথ এভাবে ঘুমিয়ে থাকলো তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেল, এক বিরলতম রোগে আক্রান্ত ১৭ বছরের বেথ গুডিয়ার। এই রোগের নাম ক্রেন লেভিন সিনড্রোম (কেএলএস ) ওরফে স্লিপিং বিউটি সিনড্রোম।

এটি এক বিরল ও জটিল স্নায়ুর অসুখ। এই অসুখে স্নায়ুদুর্বলতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যে মাসের পর মাস ঘুমিয়ে থাকে মানুষ। সাম্প্রতিক জার্নালের লেখকদের দাবি, এই রোগের সবই মিলে যাচ্ছে আজকের হাইপোথ্যালামিক ওবেসিটির সঙ্গে। এই রোগে রোগীর মধ্যে এতটাই অবসাদ আর ক্লান্তি তৈরি করে যে স্নায়ু প্রায় অবশ হয়ে যায়। খিদে বেড়ে যায়, আর মেজাজও চড়ে থাকে। বেথ গুডিয়ারের অসুখের সঙ্গে এই রোগের মিল থাকলেও রোগ দুটি ছিল চরিত্রগত ভাবে আলাদা। শুরুর দিকে বেথের মধ্যে মূলত ক্লেন লেভিন সিনড্রোম ( কেএলএস ) -ই ছিল।

সাধারণত বয়ঃসন্ধিকালের ছেলেমেয়েদের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে ছাোট শিশুরাও এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এই রোগে আক্রান্ত মানুষের সর্বক্ষণই ঘুম পায়। ঘুমের প্রকোপ এতটাই বেশি থাকে যে, দিনের অধিকাংশ সময়টাই ঘুমিয়ে থাকতে চায় রোগী। ঘুমের রেশ কাটানো বেশ মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় একটানা বেশ কয়েকদিন কিংবা কয়েক সপ্তাহও কেটে যায় ঘুমিয়ে।

১৬ বছর বয়স অবধি বেথ গুডিয়ারের মধ্যে এই রোগের কোনো উপসর্গই দেখা যায়নি। ছোটবেলা থেকে আর পাঁচটা ছেলেমেয়ের মতোই সুস্থ- সবল ছটফটে ছিল সে। পড়ালেখায়ও ছিল দুর্দান্ত। আর পাঁচটা মেয়ের মতোই তার ছেলেবেলা কেটেছে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে হৈ চৈ করে। ক্লাস টেন পাশ করার পর থেকেই শিশু মনস্তত্ত্ব নিয়ে পড়ার স্বপ্ন ছিল বেথের। মা বাবাও স্বপ্ন দেখতেন তাদের আদরের মেয়ে একদিন অনেক বড় হবে, মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে তুলবে। তবে ১৭ বছরের জন্মদিনের সন্ধ্যায় সব কেমন পালটে গেল তাদের জীবনে। সব আলো মুছে গিয়ে শুরু হল এক অন্ধকার অধ্যায়।

প্রথম দফায় টানা প্রায় ছ’মাস গড়ে বাইশ ঘণ্টা করে ঘুমিয়ে থাকত বেথ। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, সাধারণত ১৫ থেকে ১৬ বছর বয়সেই এই রোগ হানা দেয় মানুষের শরীরে। বেথের বয়স যখন ১৭ , তখন তার শরীরে ধরা পড়ে কেএলএস এর লক্ষণ। বেথের মা বলেন, জন্মদিনের পরের পাঁচ বছর শতকরা ৮৫ ভাগ সময়ই ঘুমিয়ে কাটিয়েছে তার মেয়ে। সেই সময় নামমাত্র খাওয়া, পানি পান আর মল – মুত্র ত্যাগ করা ছাড়া আর কোনো কাজই করতে পারতনা সে। অচেতনের মতো ঘুমিয়ে কাটাত সারাদিন। যে সময়টা জেগে থাকত সেই সময়টাও তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় কাটত বেথের। বাচ্চাদের মতো করে কথা বলা, মুখ দিয়ে লালা পড়া, আর তেল-মশলাযুক্ত জাঙ্ক ফুড খাওয়ার জন্য বায়না করা এভাবেই কেটেছে পাঁচটা বছর। অসুস্থ হওয়ার পরবর্তী পাঁচ বছরে কেবল কয়েকবার ডাক্তারের কাছে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়েছে বেথ। সেই সময়েও হুইল চেয়ারে করে নিয়ে যেতে হয়েছে , নিজের পায়ে হেঁটে যাওয়ার ক্ষমতাও ছিল না তার।

আজ প্রায় এক দশক অতিক্রান্ত হয়েছে। এতগুলো বছর পার হয়ে যাওয়ার পরেও সুস্থ করে তোলা যায় নি তাকে। বরং তার মধ্যে এখন কিহু রোগের উপসর্গও দেখা দিয়েছে। যা চিকিৎসকদেরও চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। আক্রান্ত হওয়ার বছর দুয়েক পর ঘুমের প্রভাব কিছুটা কমলেও স্নায়ুতে এক অদ্ভুত অসুখ ধরা পড়েছে বেথের। এই কয়েক বছরে তার শরীরে কোলাজেন কমে যাওয়ায় মেরুদণ্ড এতটাই নমনীয় হয়ে গেছে যে যে কোনো সময় মাথার সঙ্গে ঘাড়ের সংযোগকারী মেরুদন্ডের হাড় সরে যেতে পারে। বেথকে এটাও জানানো হয়েছে যে তার মস্তিষ্ক তার মেরুদণ্ডের উপরের অংশে থেকে নীচে নেমে যাচ্ছে। দীর্ঘ ১০ বছর শুয়ে থাকার ফলেই তার শরীর আর মেরুদণ্ডের এই অবস্থা। শরীরের পেশীগুলোও অত্যধিক শিথিলও হয়ে পড়েছে। জেগে থাকলেও চলা ফেরার ক্ষমতা তার একেবারেই নেই। বেথ তার বন্ধুদের সঙ্গে গল্পও করতে পারেনা, কারণ একটু জোরে কথা বললে, হাসলে বা মাথা নাড়লে তার কষ্ট হয়।

ইডিএস উপসর্গ ধরা পরার আগে যখন ক্রেন লেভিন সিনড্রোম ( কেএলএস) ছিল তখন বেথ হয়তো ঘুমিয়ে থাকতো সারাদিন। তবে এতোটা ভয়ের কিছু ছিলনা। এখন যতই দিন যাচ্ছে ততই অবনতির দিকে চলে যাচ্ছে বেথের শরীর। বিশেষ করে শেষ একবছর তাকে একদম শয্যাশায়ী করে দিয়েছে। আগে ২২ ঘণ্টা ঘুমের মধ্যে থাকলেও হাঁটাচলার ক্ষমতাটুকু ছিল তার। তবে এখন আর একদমই হাঁটতে পারে না বেথ। বেথের বর্তমান শারীরিক অবস্থা যা, তাতে অপারেশন করা ছাড়া কোনো রাস্তা নেই। জটিল এই অপারেশনে খরচ অনেক বেশি। যা গুডিয়ার পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে। মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচারে প্রাণের ঝুঁকিও কম নয় । সব জেনেও হার মানেনি বেথ । নিজেকে হাসিখুশি রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সবসময়।

তবে এই ভয়ংকর সংগ্রামের গল্পের ভেতরেও লুকিয়ে আছে এক টুকরো রূপকথা। বেথের জীবনের সেই রূপকথা হল তার ভালোবাসার মানুষটি। যে আজও বেথের হাত ধরে রেখেছে। যে হাত ধরে সে সারাজীবন পাশে থাকার কথা দিয়েছিল। রোগে আক্রান্ত হওয়ার দু’বছর আগে বেথের সঙ্গে পরিচয় হয় ড্যানের। পেশায় প্রাথমিক স্কুল শিক্ষক ২৫ বছর বয়সী ড্যান প্রেমে পড়েছিল ষোড়শী বেথের। ২০১১ তে বেথ যখন অসুস্থ হয়ে পরে তখন বেথের হাত ধরে ড্যান কথা দেয়, যাই হয়ে যাক বেথের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত থাকবে সে। এরপর ১০ বছর কেটে গেছে। সেরে ওঠার বদলে দিনে দিনে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছে বেথ। তবু কথা রেখেছে ড্যান, এতগুলো বছরেও প্রেমিকাকে ছেড়ে কোথাও যায়নি সে।

সব জেনেও হার মানেনি বেথ, নিজেকে হাসিখুশি রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সবসময়

বেথের পরিবার ও ড্যানের প্রধান লক্ষ্যই এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব টাকার জোগাড় করা। তার জন্য দেশেবিদেশের বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সাহায্যও নিচ্ছে তারা। ড্যান এখনও বেথকে পাগলের মতো ভালোবাসে। পরিবারের নিষেধ সত্ত্বেও বেথকে একমুহূর্তের জন্যও কাছছাড়া করেনি সে। বেথের জীবনে আশার আলো জ্বালিয়ে রেখেছেন তার ভালোবাসার এই মানুষটি। হয়তো রূপকথার স্লিপিং বিউটির মতোই একদিন ড্যানের ভালোবাসার শক্তিতেই বেথ সুস্থ হয়ে ফিরে আসবে।

Tagged