http://igeneration.com.bd/wp-content/uploads/2021/04/ভাতের-অভাবে-দুর্বিষহ-জীবন.jpg

ভাতের অভাবে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন শিক্ষক মুজিবুর!

ফিচার

সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি কিংবা লেখাপড়া করে যে গাড়ি ঘোড়ায় চড়ে সে- এসব ছড়া পড়াতে পড়াতে তার শ্রেণিকক্ষ হতো মুখরিত। তার সুরলিত কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে শিক্ষার্থীরাও দেখিয়েছে কণ্ঠের যাদু। এ শিক্ষকের কাছ থেকে পড়াশোনা করে আজ অনেক শিক্ষার্থীই পৌঁছেছেন জীবনের সফলতার চূড়ায়।

শিক্ষক মুজিবুর রহমান মন্ডল (৮০)। আজ জীবনের শেষ সময়ে এসে সহায়-সম্বলহীন জীবন-যাপন করছেন। শ্রেণিকক্ষের ব্ল্যাকবোর্ডে চকের আঁচড়ে যে হাত ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য আশা জাগানিয়া, সেই হাতই আজ অন্যের কাছে পাততে হচ্ছে মাত্র দু’মুঠো ভাতের জন্য। তিনি দিনাজপুর জেলার বিরামপুর উপজেলার ২নং মুকুন্দপুর ইউনিয়নের পটুয়াকোল গ্রামের মৃত ছলিম উদ্দিন মন্ডলের ছেলে। ১৯৮০ সালে জেলার ফুলবাড়ি উপজেলার বলিভদ্রপুর দাখিল মাদ্রাসায় কারি পদে ৩শ’ টাকার বেতনের চাকরি নিয়েছিলেন। ৩৪ বছর চাকরি করে ২০১৪ সালে অবসর নেন। অবসরকালে সরকারি তহবিল থেকে যা পেয়েছিলেন তা দিয়ে ব্যাংক ঋণের অংশবিশেষ পরিশোধ ও মেয়ের বিয়ের খরচ করতে গিয়ে ‘নুন আনতে পান্তা ফুরানো’র দশা এই শিক্ষকের।

বর্তমানে তার নিজের কোনো জমাজমি নেই। শেষ সম্বল বলতে পৈত্রিকসূত্রে পাওয়া ১২ শতক জমি। সেটিও মোহরানা হিসেবে প্রিয় স্ত্রীকে অর্ধেক আর বাকি অর্ধেক লিখে দিয়েছেন তার একমাত্র ছেলে আবুল কালাম আজাদকে (৩৬)। স্ত্রী, এক ছেলে ও তিন মেয়ের সুখের জন্য জীবনের অঙ্ক মেলাতে গিয়ে নিজের হিসেবের খাতাটি কখন যে শূন্য হয়েছে তা খেয়ালই করেননি। তাই তো নিজেই এখন হয়েছেন সম্বলহীন।

স্ত্রীকে নিয়ে টিনের ছাউনি দেয়া এক ঝুপড়ি ঘরেই থাকেন। শুধু তাই নয়, সংসারে যখন অভাব-অনটন তখনও মাথার উপর এক লক্ষ টাকার বেশি ব্যাংক ঋণ। এ বিশাল ঋণ কিভাবে শোধ করবে এই চিন্তায় মাঝেমধ্যে ভেঙে পড়েন বয়সের ভারে নুয়ে পড়া মুজিবুর রহমান। একমাত্র ছেলে আবুল কালাম আজাদ (৩৬) রাজমিস্ত্রির কাজে অন্যের বাড়িতে শ্রম দেন। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে তারও অভাবের সংসারে চলে নিত্য টানাপোড়ন।

কয়েকমাস আগেও দু’মুঠো ভাতের ব্যবস্থা করতে প্রতি শুক্রবার এলাকার বিভিন্ন মসজিদে-মসজিদে গিয়ে সাহায্যের হাত পাততেন। একজন ভালো শিক্ষক হিসেবে এলাকায় তার জনপ্রিয়তা থাকায় অনেকেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ হলো তার দুই হাত-পায়ে প্রচণ্ড ব্যথার জন্য আর বাইরে বের হতে পারছেন না। এছাড়া করোনার জন্য দেশে লকডাউন ঘোষণায় অনেকটাই অসহায় হয়ে পড়েছেন শিক্ষক মুজিবুর। একদিকে পেটের জন্য ভাতের যোগান অন্যদিকে শরীরে বাসা-বাধা তীব্র ব্যথা ও উচ্চ রক্ত চাপের চিকিৎসা খরচ মেটানো এখন আকাশ-কুসুম কল্পনা।

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মুজিবুর রহমান মন্ডল আরটিভি নিউজকে বলেন, যখন গায়ে শক্তি ছিল তখন বাড়ি থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে সাইকেল চালিয়ে মাদরাসায় চাকরি করেছি। অবসর নেয়ার পর থেকে রোগে-শোকে আর আগের মতো চলাফেরা করতে পারি না। এখন আমার কোনো আয়-রোজগার নাই, তার উপর আবার ব্যাংক ঋণের বোঝা! আল্লাহর দয়ায় কোনোমতে বেঁচে আছি।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পরিমল কুমার সরকার জানান, সমাজের মানুষ গড়ার একজন কারিগরের জীবনের শেষ সময়ে এমনটা অত্যন্ত দুঃখজনক। সরকারিভাবে আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে বাড়ি করে দেয়ার বরাদ্দ আসলে তার জন্য বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হবে। আর অন্য কোনোভাবে সরকারি সুযোগ-সুবিধা দেয়ার সুযোগ থাকলে অবশ্যই তাকে দেয়ার চেষ্টা করা হবে।