http://igeneration.com.bd/wp-content/uploads/2021/06/According-to-the-boy-Ripon-is-doing-business-instead-of-begging.jpg

ছেলের কথায় ভিক্ষা ছেড়ে ব্যবসা করছেন প্রতিবন্ধী রিপন

সারা বাংলা

‘নবীর শিক্ষা করো না ভিক্ষা, মেহনত করো সবে’ এ দীক্ষা নিয়ে ছেলের কথায় ভিক্ষা ছেড়ে ব্যবসা করে সংসারের হাল ধরেছেন মেহেরপুরের গড়পাড়ার আলতাফ হোসেনের ছেলে প্রতিবন্ধী রিপন আলী (৫৫)। তার ব্যবসায়ে সম্বল একটি হুইল চেয়ার, একটি হ্যান্ড মাইক আর কিছু সস্তা দরের পণ্য। সংসারের ব্যয়ভার বহন করতে হিমশিম খেলেও আগের চেয়ে বেশ সম্মান বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি।

জানা গেছে, ছোটবেলায় বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হন রিপন। অন্য এক নারীকে বিয়ে করে বাবা অন্যত্র বসবাস শুরু করেন। রিপনকে নিয়ে মা পড়েন বিপাকে। পরের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে বড় করার চেষ্টা করেন মা। রিপনের বয়স যখন সাত বছর তখন তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। অভাবের সংসারে নাড়ি ছেঁড়া ধনের অসুস্থতায় মা পড়েন বিপাকে। অন্যের সহযোগিতায় চলছিল সংসার ও রিপনের চিকিৎসা। কিন্তু বিধি বাম। রিপন হয়ে পড়েন প্যারালাইজড। অবশেষে রিপনকে বেছে নিতে হয় ভিক্ষাবৃত্তির কাজ। ভিক্ষা করেই চলছিল রিপনদের সংসার।

এদিকে ছেলের চিন্তায় অস্থির মা। তিনি অসম্ভবে ছেলের দেখাশোনা কে করবে? তাই রিপনকে বিয়ে দেন সদর উপজেলার ঝাঊবাড়িয়া গ্রামে। বছর খানেক পর রিপন এক পুত্রসন্তানের বাবা হন। ছেলের বয়স যখন ৮ বছর তখন অন্যের প্রেমে পড়ে স্বামী-সন্তান রেখে ঘর ছাড়েন তার স্ত্রী।

সবাই ছেড়ে চলে গেলেও গর্ভধারিণী মা পারেননি রিপনকে ছেড়ে যেতে। ছেলে ও নাতিকে নিয়ে নেমে পড়েন জীবন সংগ্রামে। রিপনের ছেলে এখন মেহেরপুরের একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। নিজের ও সন্তানের ভবিষ্যত ভেবে রিপন ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দেন।

সব কিছু জানার পর শারীরিক প্রতিবন্ধী রিপন আলীকে মেহেরপুর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট ইয়ারুল ইসলাম একটি হুইল চেয়ার দেন। রিপন একটি পুরাতন  হ্যান্ড মাইক ক্রয় করেন। ভিক্ষায় উপার্জিত কিছু জমানো টাকায় দাঁতের মাজন, মাছি মারা বিষ, সাবান, সোডা, ব্লিচিং পাউডার, গ্যাস লাইটার, ব্যথার মলম ও মশার কয়েল বিক্রি শুরু করেন। রিপনের মা প্রতিদিন সকালে ব্যবসায়ের জিনিসপত্র সাজিয়ে ছেলেকে তুলে দেন হুইল চেয়ারে।

রিপন সারাদিন গ্রামে ফেরি করে ব্যবসা শেষে বাড়ি ফেরেন সন্ধ্যায়। মা আবার ছেলেকে হুইল চেয়ার থেকে নামিয়ে ঘরে নেন। প্রতিবন্ধী রিপনের প্রতিদিন আয় হয় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। এ স্বল্প আয় থেকে সংসার চালিয়ে ছেলেকে লেখাপড়া করান জেলার ভালো একটি স্কুলে। রিপনের ছেলের মেধা ভালো হওয়ায় শিক্ষকরাও স্নেহ করেন। রিপনের স্বপ্ন ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়ে বড় অফিসার বানাবেন।

রিপন বলেন, জীবনের শুরুটাই সংগ্রামের মধ্যদিয়ে। বাবার আদর-স্নেহ পাইনি। সংসার জীবনে সহায়তা পাওয়ার জন্য বিয়ে করেছিলাম। কিন্তু বউ আমাকে আর ছোট ছেলেকে রেখে চলে গেল। তবে মা আমাকে ছেড়ে যায়নি। আজো আমাকে শিশু বয়সের মতোই লালন-পালন করছেন।

তিনি আরও বলেন, সরকারের দেওয়া একটি হুইল চেয়ার ও আমার ছেলের কথা বদলে দিয়েছে আমার জীবন। ভিক্ষা করতে গিয়ে লজ্জায় পড়তে হতো বিভিন্ন সময়। এখন ব্যবসা করি। ভিক্ষার চেয়ে ব্যবসা অনেক সম্মানের। এখন আমি গর্ব করে বলি, আমি প্রতিবন্ধী হয়েও অন্যের দ্বারস্থ না হয়ে রোজগার করে খাই। তবে বিভিন্ন এলাকার মানুষ আমাকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন।

সদর উপজেলার টেঙগারমাঠ গ্রামের বাসিন্দা হাসিনা বেগম বলেন, রিপন আমাদের দুয়ারে ভিক্ষা করতে আসতেন। তবে এখন সে ব্যবসা করছেন। আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তার কাছ থেকে ক্রয় করি।

শ্যামপুর গ্রামের তোফায়েল জানান, রিপনের প্রচেষ্টার কারণে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আমরা তার কাছ থেকেই কিনি যেন সে কিছু আয় করতে পারে।

মেহেরপুর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট ইয়ারুল ইসলাম জানান, রিপনের চলাফেরার জন্য একটি হুইল চেয়ার দেওয়া হয়েছিল। চেয়ারটিকে ব্যবসার কাজে লাগিয়ে নিজের জীবনের গল্পটাই বদলে নিয়েছে। এটি একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। প্রতিবন্ধী হয়ে রিপনের বুদ্ধিমত্তা প্রশংসার দাবিদার।

মেহেরপুর সমাজসেবা অধিদফতরের উপ-পরিচালক সন্তোষ কুমার নাথ জানান, সরকারিভাবে ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন করার উদ্যোগ রয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে অনেকের মাঝে আর্থিক সহায়তা দিয়ে দোকান নির্মাণ, গরু পালন, হাঁস-মুরগি পালনে সহায়তা করেছি। তবে অনেকেই সরকারি সুবিধা নিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়েনি। ব্যবসায় আয় কম এবং ভিক্ষাবৃত্তিতে আয় বেশি হওয়ায় অনেকের মানসিকতা পরিবর্তন হয়নি। যার ফলে আমরা সম্পূর্ণভাবে সফল হতে পারিনি। তবে এর মধ্যে বিবেক-বুদ্ধি আর সম্মানের কারণে প্রতিবন্ধী রিপন জেলার এক দৃষ্টান্ত। আমাদের পক্ষ থেকে তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।

Tagged