http://igeneration.com.bd/wp-content/uploads/2021/05/Babul-Akhter-broke-the-call-record-of-28-seconds.jpg

২৭ সেকেন্ডের যে কল রেকর্ডে ফাঁসলেন বাবুল আক্তার

সারা বাংলা

পাঁচ বছর আগে চট্টগ্রামে বহুল আলোচিত মাহমুদা খানম মিতু হত্যাকাণ্ডে তাঁর স্বামী সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারকে ‘আটক’ করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ মামলার বাদী থেকে এখন এ হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি তিনি। তাকে ৫ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত।

মূলত ২৭ সেকেন্ডের কল রেকর্ডে পাল্টে যায় মিতু হত্যাকাণ্ডের মামলার গতিপথ। এতেই বেরিয়ে আসে পুলিশের সাবেক এসপি বাবুল আক্তারের এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ। বুধবার (১২ মে) মামলার তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এর একাধিক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, মিতুকে হত্যাকাণ্ডের দিন সকাল ৭টা ৩৭ মিনিটে মুছা নামের এক ব্যক্তির মোবাইলে ফোন করেন বাবুল আক্তার। সালাম দিয়ে মুছা ফোনটি রিসিভ করতেই ওপার থেকে বাবুল আক্তার বলেন, ‘তুই কোপালি ক্যান?’ ৩ থেকে ৪ সেকেন্ড থেমে আবার বলেন, ‘বল তুই কোপালি ক্যান? তোরে কোপাতে কইছি?’ এর পর ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন বাবুল আক্তার।

হত্যাকাণ্ডের প্রায় দুই সপ্তাহ পর পুলিশের কাছে এই ফোন রেকর্ড আসার পর ঢাকার বনশ্রী শ্বশুরের বাসা থেকে ঢাকা গোয়েন্দা কার্যালয়ে ডেকে নেয়া হয় বাবুল আক্তারকে। গোয়েন্দা কার্যালয়ে প্রায় ১২ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি থাকার পর তিনি পুলিশের চাকরি থেকে পদত্যাগপত্র দিয়ে মুক্তি পান। যদিও বাবুল বলছেন তাকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে।

শুরু থেকেই পুলিশের সন্দেহের তালিকায় ছিলেন বাবুল আক্তার। তার শ্বশুর মোশাররফ হোসেন তার মেয়ের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বাবুলের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছিলেন।

সর্বশেষ ১১ মে বাবুল আক্তারকে ঢাকা থেকে ডেকে নিয়ে দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ করেন পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো বিভাগের কর্মকর্তারা। এরপর তাকে পিবিআই হেফাজতে রাখা হয়। তার বিরুদ্ধে নতুন করে বাদি হয়ে মামলা দায়ের করেন মিতুর বাবা। এই মামলায় বাবুল আক্তারকে প্রধান আসামি করা হয়। বর্তমানে বাবুল আক্তার ওই মামলায় ৫ দিনের রিমান্ডে আছেন।

এনজিওকর্মীর সঙ্গে বাবুল আক্তারের পরকীয়ার কারণে তার মেয়েকে খুন হতে হয়েছে দাবি করে মিতুর বাবা এজহারে উল্লেখ করেন, কক্সবাজার জেলায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে কর্মরত থাকার সময় ২০১৩ সালে ইউএনসিসিআর এর কর্মী গায়ত্রী অমর শিংয়ের সঙ্গে পরকীয়া প্রেমে জড়িয়ে পড়েন। এনিয়ে মিতুর সঙ্গে দাম্পত্য কলহ শুরু হয় তার। কলহের সময় মিতুকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করেন বাবুল। এরই মধ্যে ২০১৪ সালের জুলাই মাসে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত সুদানে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে ছিলেন বাবুল আক্তার। এসময় বাবুল আক্তারের মোবাইল ফোনটি চট্টগ্রামের বাসায় ছিল। ওই মোবাইল ফোনে মোট ২৯ বার ম্যাসেজ দেন গায়ত্রী অমর শিং।

এরই মধ্যে গায়ত্রী অমর শিংয়ের দেওয়া দুটি বই পাওয়া যায়। বই দুটি বাবুল আক্তারকে উপহার দিয়েছিলেন গায়ত্রী। ওই বইয়ের একটির তৃতীয় পৃষ্ঠায় গায়ত্রী নিজ হাতের লেখা রয়েছে ‘05/10/13, Coxs Bazar, Bangladesh. Hope the memory of me offering you this personal gift. shall eternalize our wonderful bond, love you. Gaitree.’ একই বইয়ের শেষ পৃষ্ঠায় ২৭৬ এর পরের পাতায় ১ নম্বর বিবাদী বাবুল আক্তার নিজের হাতে ইংরেজিতে গায়ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের কথা লেখা আছে। তিনি লিখেছেন (বাবুল) ‘First Meet : 11 Sep, 2013, First Beach walk 8th Oct 2013, G Birth day 10 October, First kissed 05 October 2013, Temple Ramu Prayed together, 13 October 2013, Ramu Rubber Garden Chakaria night beach walk’.

মামলার বাদী এভাবেই বাবুল আক্তার ও গায়ত্রীর হাতের লেখা মামলার এজাহারে উল্লেখ করে আরো লেখেন, এই পরকীয়া প্রেমের কারণে বাবুল মিতুর দাম্পত্য অশান্তি চরমে পৌঁছে। বাবুল আক্তারের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে মিতু প্রতিবাদ করলে তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে। এই নির্যাতনের বিষয়টি মিতু বাবা-মাকে জানিয়েছিল।

বাদী এজহারে লিখেন, তিনি বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছেন গত ৬ জুন ২০১৬ তারিখে পাঁচলাইশ থানায় বাবুল আক্তার বাদী হয়ে যে হত্যা মামলাটি দায়ের করেছেন সেই মামলার তদন্ত পর্যায়ে তদন্ত কর্মকর্তা মিতু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বাদী বাবুল আক্তার জড়িত থাকার প্রাথমিকভাবে প্রমাণ পাওয়ায় উক্ত মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন সত্য, ধারা ৩০২/১০৯/৩৪ পেনাল কোড বিজ্ঞ আদালতে দাখিল করেন। এমতাবস্থায় মাহমুদা খানম মিতু হত্যাকাণ্ডের ন্যায় বিচারের নির্মিতে সকল বিবাদীদের বিরুদ্ধে নিজে বাদী মামলা দায়ের করেন।

মামলার আসামিরা হলেন সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার, তার সোর্স মো. কামরুল ইসলাম শিকদার, এহতেশামুল হক ভোলা, মো. মোতালেব মিয়া ওরফে ওয়াশিম, মো. আনোয়ার হোসেন, মো. খায়রুল ইসলাম কালু ওরফে কসাই কালু, মো. সাইদুল ইসলাম সিকদার ও শাহজাহান মিয়া।

মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন এই মামলা দায়ের করার আগেই চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আদালতে মিতু হত্যাকাণ্ডের পর বাবুল আক্তার বাদী হয়ে দায়ের করা মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা এই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। সেই চূড়ান্ত প্রতিবেদনেই বাবুল আক্তার ঘটনার সঙ্গে জড়িত মর্মে তথ্য পাওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া বাবুল আক্তারের মাধ্যমে সোর্স মুছা কিভাবে যুক্ত হয়েছে সেই বিষয়েও চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তথ্য উল্লেখ রয়েছে। মোশাররফ হোসেনের এই মামলায় বাবুল আক্তারকে গ্রেপ্তার দেখানোর প্রক্রিয়া চলছে।

             ফ্রি কুইজে অংশগ্রহণ করে জিতে নিন ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত পুরস্কার

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে চট্টগ্রাম নগরীর জিইসি মোড়ে ছেলেকে স্কুল বাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় সড়কে খুন হন পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রী মিতু। পদোন্নতি পেয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে যোগ দিতে ওই সময় ঢাকায় ছিলেন বাবুল। এর আগে তিনি চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশে কর্মরত ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের পর নগরীর পাঁচলাইশ থানায় অজ্ঞাত পরিচয় কয়েকজনকে আসামি করে মামলা করেন বাবুল। তবে পুলিশ তদন্তে তার সম্পৃক্ততার গুঞ্জন ছিল আগে থেকেই। এরপর তিনি চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। বাবুল সেসময় দাবি করেন তার স্ত্রী জঙ্গি হামলায় নিহত হয়ে থাকতে পারেন।

Tagged