http://igeneration.com.bd/wp-content/uploads/2021/04/কেউ-একটা-আইসিইউ-বেড-দেবেন-আমার-বোনটা-পৃথিবী-ছেড়ে-চলে-যাচ্ছে.jpg

কেউ একটা আইসিইউ বেড দেবেন, আমার বোনটা পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছে

সারা বাংলা

কদিন আগেই করোনায় আক্রান্ত ছোটবোনকে হারিয়েছেন সাংবাদিক এফ আই দীপু। বোনের চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিজের নাজেহাল হওয়ার বিষয়টি নিজের ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাসের মাধ্যমে কেউ একটা আইসিইউ জানিয়েছেন তিনি। নিচে সেই স্ট্যাটাসটি পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো।

হ্যাঁ, আমার বিশ্বাস ছিল দেশের প্রতি, দেশের সিস্টেমের প্রতি, কোভিড নিয়ন্ত্রণে সদ্য গড়ে তোলা সরকারের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি। কিন্তু সেটা নষ্ট হয়ে গেছে। একেবারে পঁচে গেছে। নষ্ট, পঁচাগলা সেই বিশ্বাস থেকে এখন দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে!

কেন জানেন?

তাহলে শুনুন-

২০ এপ্রিল করোনাক্রান্ত আমার মুমূর্ষ বোনকে বাঁচাতে একটা আইসিইউর জন্য পাগলের মতো ঘুরছিলাম। ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলাম। অনেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন। স্কয়ার হাসপাতালে আইসিইউ খালি আছে বলেও জানিয়েছেন। কিন্তু সেখানকার খরচ চালানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য ছিল না। বেশিরভাগ শুভাকাঙ্ক্ষী পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত রাজধানীর মহাখালী ‘ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতাল’-এ যাওয়ার জন্য। মাত্র দুইদিন আগে উদ্বোধন হয়েছে। সেখানে ১০০ আইসিইউ শয্যা আছে। বেশিরভাগ এখনও খালি। কেউ কেউ নিশ্চিতও করেছেন।

আশায় বুক বাঁধলাম। সরকারি হাসপাতাল, তাতে কী হয়েছে! বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালনা করছে। নিশ্চয়ই কোনো অনিয়ম নেই সেখানে! ১৮ এপ্রিল, মাত্র দুইদিন আগেই তো চালু হয়েছে। সেদিন শাহজাহানপুর ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল থেকে মুমূর্ষ বোনকে নেয়ার জন্য একটা আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স পাইনি। ৯৯৯-এ ফোন দিলাম। চেষ্টা করে তারাও পারেনি। হাইফ্লো অক্সিজেন দিয়ে শেষ পর্যন্ত বোনকে নিলাম ডিএনসিসি হাসপাতালে। কিন্তু কে জানতো, ওখানে স্বয়ং মৃত্যুদুত আজরাইলের পাশাপাশি কতগুলো মানুষরূপী আজরাইলও বসে আছে আমার বোনের জান কবচের জন্য!

সেদিন ডিএনসিসি হাসপাতালের কেউ বাইরে দাঁড়ানো অ্যাম্বুলেন্সের সামনে আসেনি আমার মৃত্যুপথযাত্রী বোনের অক্সিজেন লেবেল মাপার জন্য। আমিই মেপে দৌঁড় দিয়ে ডিউটি ডাক্তারকে জানালাম, লেবেল কমছে। তখনও ৬৭। ডাক্তার ভর্তি ফরমে আইসিইউ লিখে দিলেন। বলা যায় লিখতে বাধ্য করলাম। কারণ আগের হাসপাতাল থেকেই জরুরী আইসিউই দরকার বলে রেফারেন্স পেপার ছিল। মহামান্য ডাক্তার কিন্তু উঠেও দেখলেন না রোগীর অবস্থা কী? না, সেদিন ওই হাসপাতালে রোগীর কোনো চাপ ছিল না। অথচ আমার বোন তখন অ্যাম্বুলেন্সে মৃত্যর প্রহর গুনছে!

অ্যাম্বুলেন্স থেকে বোনকে নামাবো, একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার নেই। মনে রাখবেন, তখন মাত্র দুদিন হলো হাসপাতাল উদ্বোধনের! সবকিছুই পূর্ণ থাকার কথা ছিল! শেষ পর্যন্ত একটি সিলিন্ডার পেলাম, তাও অক্সিজেন শেষের পথে। মাত্র ২% অক্সিজেন আছে সিলিন্ডারে। সেটাও কেন পড়ে আছে জানেন? সিলিন্ডারের মাথায় লাগানোর নজল নেই বলে। চিৎকার দিয়ে বললাম, নেই কেন? চিৎকার শুনে চারটি নতুন নজলের প্যাকেট বের করলেন কর্তব্যরতরা। কিন্তু কোনোটিই সিলিন্ডারের মুখে সেট হচ্ছে না। কারণ কী জানেন? এগুলো এতটাই নিম্নমানের যে, নতুন প্যাকেট খোলার পর দেখা গেল কোনোটির পাইপ লাইন ঠিক নেই, কোনোটির প্যাচ কাটা!!! তখনও আমার বোন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে অ্যাম্বুলেন্সে। যখন তার দরকার ছিল আইসিইউ!

শেষ পর্যন্ত একটা নজল সেট হলো। সেটা নিয়ে দৌঁড় দিলাম বোনের কাছে। অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামালাম। লিফটের জন্য অপেক্ষা করছি। ৫ তলায় আইসিইউ। কিন্তু সেই লিফট আর আসে না। প্রতি তলায় থামছে। কেন জানেন? রোগীর জন্য বরাদ্ধ লিফটি তখনও বন্ধ। অথচ হাপসাতাল উদ্বোধনের মাত্র দুদিন হল তখন! সবকিছু ঝকঝকে চকচকে সচল থাকার কথা ছিল!

লিফট যখন পেলাম, দ্রুত ছুটলাম আইসিইউতে; কিন্তু ওয়ার্ডবয় কিংবা নার্সরা জানেন না আইসিইউ কোথায়! তারা ট্রলিতে আমার মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়া বোনকে নিয়ে ঘুরছেন। খুঁজেও পেলাম একসময়। কে জানতো, সেখানেও ঠাঁই হবে না আমার বোনের! ১০০ শয্যার আইসিইউ পুরোটাই ভর্তি। রোগী কারা জানেন? বেশিরভাগই অধিকতর সুস্থ। যে কেউ একনজর দেখে বলে দিতে পারবেন, যাদের বেশিরভাগেরই আইসিইউ প্রয়োজন নেই। কেউ কী দেখেছেন, আইসিইউতে শুয়ে থাকা রোগী মিটমিট করে অন্যের দিকে চেয়ে থাকেন? কেউ আবার আধশোয়াও! আমি দেখেছি সেদিন, মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে সেসব রোগীদের ডাক্তার আর এটেন্টডেন্টদের দিকে চেয়ে থাকতে! দেখেছি আর মৃত্যপথযাত্রী বোনের ট্রলি নিয়ে ঘুরেছি। চিৎকার করে বলেছি- কেউ একটা আইসিইউ বেড দেবেন, আমার বোনটা পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছে!

কেউ শুনলো না। কেউ দিল না। কারও মন গললো না! আমি দেখেছি, আমার চিৎকারে আইসিইউ বেডে শুয়ে সেসব অমানুষেরাও মুখ লুকাচ্ছেন।

অসহায় চোখে ডাক্তারকে বললাম- ডাক্তার, ওদের অনেককেই তো আইসিইউর রোগী বলে মনে হচ্ছে না। এই দেখেন কীভাবে তাকাচ্ছে? একজনকে এইচডিইউতে দেন। আমাকে একটা আইসিইউ বেড দেন। আমার বোনকে বাঁচান।

ডাক্তার বললো, আমাদের কিছু করার নেই, ভাই। এগুলো আমরা নিয়ন্ত্রণ করি না।

তাহলে কারা নিয়ন্ত্রণ করে এসব আইসিইউ?

ডাক্তার নিরুত্তর।

ততক্ষণে আমার বোনের শরীর নিথর হয়ে গেছে। নিষ্ঠুর পৃথিবীকে বিদায় জানিয়েছে সে। বোন দেখেছে, মানুষরূপী কতগুলো আজরাইলও তার চারপাশে শুয়ে ছিল। যারা তাকে ইচ্ছা করলে পৃথিবীতে আরও একটু দম নেয়ার সুযোগ করে দিতে পারতো!

অথচ, কত আশা করে গিয়েছিলাম, মাত্র দুদিন আগে শুরু হওয়া অত্যাধুনিক একটা সরকারি হাসপাতালে, যেটার নিয়ন্ত্রণ ছিল সেনাবাহিনীর হাতে, যেখানে কতগুলো পেশাদার ডাক্তার থাকার কথা ছিল, যেখানে ১০০ আইসিইউ ছিল, যেখানকার সবগুলো মেশিনারিজ ছিল সম্পূর্ণ নতুন, সদ্য প্যাকেট খোলা! কিন্তু কে জানতো, সেখানে আজরাইল আরও দ্রুত জান কবচ করে, মানুষরূপী আজরাইলদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে!

হায় বাংলাদেশ, সেদিন তুমি শুধু একটা ভাইয়ের চিৎকারে কর্ণপাত করনি, দুইটা অসহায় ছেলেকে মা ডাকার অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছ, একটা সাজানো গোছানো সংসারকে তছনছ করে দিয়েছ! তুমি দেখিয়েছ, একটা বৃদ্ধা মাকে কীভাবে মেয়ের কবরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের মৃত্যুর অপেক্ষা করতে হয়!

প্রিয় বাংলাদেশ, আমি তোমাকে গালি দিতে পারি না। কারণ বোন হারানোর বুকের ক্ষত আমার এখনও শুকায়নি! হয়তো শুকাবেও না কোনোদিন। শুধু তোমার কারণে, তোমাকে বিশ্বাস করার কারণে আমার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ হবে আজীবন!