http://igeneration.com.bd/wp-content/uploads/2021/04/অভাবে-সাউথইস্ট-ইউনিভার্সিটি.jpg

অভাবে সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি ছেড়ে যাওয়া জাবের এখন সফল উদ্যোক্তা

বিজনেস বিজনেস আইডিয়া

ছোটবেলা থেকেই বিবিএ শেষ করে চার্টার্ড একাউন্টেন্ট হওয়ার স্বপ্ন ছিল জাবেরের। সেই স্বপ্ন পূরণে ভর্তি হন সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটিতে। তবে প্রথম বছর শেষ করার পর পরই সংসারে দেখা দেয় তীব্র অভাব।

বাবার পক্ষে সন্তানের পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। তাই মনের বিরুদ্ধে লালিত স্বপ্নকে মাটি চাপা দিয়ে চলে আসেন বাড়ি। ইতি ঘটে পড়াশুনার। কিছু দিন মন খারাপ থাকলেও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর তীব্র ইচ্ছে অনুভূত হয় তার মধ্যে। সেই প্রবল ইচ্ছে শক্তি আর সামনে এগিয়ে যাওয়ার অসম লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন সফল উদ্যোক্তা হওয়ার।

যেই জাবের টাকার অভাবে সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি ছেড়ে একদিন বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। এখন তিনি একজন সফল উদ্যোক্তা। চাকরি করবো না চাকরি দেব তার এই স্লোগান অনুসরণ করে এগিয়ে আসছেন এলাকার অনেকেই।

কুমিল্লার বরুড়ার সর্ব দক্ষিণের ইউনিয়ন লক্ষীপুরের নলুয়া চাঁদপুর গ্রামের ৩৫ বছর বয়সী তরুণ উদ্যোক্তা জাবের হোসাইন। কিন্তু এই বয়সেই নিয়েছেন জীবনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। কোনো প্রশিক্ষণ বা বই পড়া ছাড়াই শুরু করেন নতুন নতুন কাজ।

কখনো দেশি বিদেশি ভিন্ন ভিন্ন জাতের মাছ আবার কখনো বিদেশি জাতের গরু পালন। উপজেলার তালিকাভুক্ত খামারিদের মধ্যে তিনি একজন হলেও তার ছিল না কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা বা প্রশিক্ষণ।

জাবের ২০১২ সালে সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ প্রথম বর্ষে ভর্তি হন। মাত্র এক বছরের মাথায় আর্থিক সমস্যার কারণে ছেড়েদেন পড়াশোনা। চলে আসেন নিজ গ্রাম নলুয়া চাঁদপুরে। গ্রামে আসলেই সমাজে প্রশ্ন বিদ্ধ হতে থাকেন। কি করেন? কিভাবে চলেন ইত্যাদি নানান ধরনের কটু কথা তাকে মুখ বুঝে সহ্য করতে হয়েছে। তার দুঃসময়ে এগিয়ে আসেন বড়ভাই এমরান হোসাইন।

ইতালি প্রবাসী বড় ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় ২০১৬ সালে প্রথম শুরু করেন গরু পালন। দেশি বিদেশি বিভিন্ন জাতের গরুর খামার গড়ে তোলেন নিজের বসত ভিটার পাশেই। তবে বিভিন্ন প্রতিকূলতা আর প্রতিবন্ধকতাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গিয়েছেন তবে লাভের মুখ দেখেন নি তখনও।

এভাবেই কোনো লাভ ছাড়াই ৩ বছর পার করলেন জাবের। ২০১৯ সালের দিকে জাবের বাড়ির পাশে প্রথমবারের মত গড়ে তুললেন বিদেশি শিং মাছের ফিশারি, ব্যয় করেন ৭ লাখ টাকা। এক রকম নিজের সঙ্গে বাজি ধরেই ছেড়ে দিয়েছেন এই টাকার মায়া। কিন্তু তার ভাগ্য তাকে ছাড়েনি।

তিনি বলেন, আমার কাজের ওপর খুবই যত্নশীল ছিলাম। কখনো নিজের কাজে ফাঁকি দেয়নি। আর যে কাজ চ্যালেঞ্জের সে কাজই আমার কাছে ভালো লাগে। অবিশ্বাস্য হলেইও সত্যি নিজেও বিশ্বাস করতাম না। মাত্র ১ বছরে এতটা লাভবান হবো।

বর্তমানে ১৩৬ শতক জায়গায় দেশি মাগুর ও শিং মাছের চাষ করেছি। এছাড়াও খামারে আছে ১৭টি বিদেশি জাতের গরু, যার প্রতিটির মূল্য লাখেরও বেশি। এই প্রজেক্টে কাজ করে দুইজন সহকারী রয়েছেন। তারা এই প্রজেক্টে কাজ করেই তাদের পরিবার চালায়।

জাবের হোসেন জানান, তার স্বপ্ন ছিল ব্যাংকার হওয়ার। কিন্তু এখন সফল উদ্যোক্তা হওয়াতে নিজেকে আর ব্যর্থ মনে করছেন না।

জাবের হোসাইন বলেন, পরিকল্পনা আছে লেয়ার মুরগিরর খামার করার। যার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। খুব শিগগিরই লেয়ার মুরগির খামার করবো। আশা করি, লেয়ার মুরগির খামার করলে এলাকার আরো তিন থেকে চারজন বেকার যুবকের কর্মসংস্থান হবে।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নাসরিন সুলতানা তনু বলেন, বরুড়া উপজেলায় জাবেরের মতো আরো উদ্যোক্তা তৈরি হোক এটা আমি চাই। করোনা মহামারির সময়ে উপজেলার সব খামারিদের কাছে সরকারি সেবা পৌঁছে দিয়েছি। তাদের খামারের জন্য টিকা বরাদ্দ আছে। তারা চাইলে যেকোনো সময় উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে সেবা নিতে পারেন। এছাড়াও মহামারির সময়ে তাদের প্রণোদনা দেয়া হয়েছে।

এলাকাবাসী জানান, জাবের যখন গরু পালন শুরু করেন তখন এটা তারা ভালোভাবে নেননি। কারণ, শিক্ষিত ছেলে কেন গরু ছাগল পালবে। এখন জাবেরের উন্নতি দেখে বুঝতে পারছি এই পেশায় শিক্ষিত লোক যত বেশি আসবে ততই এলাকা উন্নত হবে। কারণ তারা গরু পালন করেন নিজেদের উন্নয়নের স্বার্থে। আর জাবেররা গরু পালন করে নিজেদের পাশাপাশি সমাজের উন্নয়নের জন্য।